বিভূতিভুষণ বন্দ্যোপাধ্যায় মোট কতটি উপন্যাস লিখেছেন সে সংখ্যা নির্ধারণ একটু গোলমেলে ঠেকতে পারে। কারণ কিছু উপন্যাস তিনি অসমাপ্ত রেখে মৃত্যুবরণ করণ যা তার ছেলে তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় সমাপ্ত করেন।
তবে সামগ্রিকভাবে তার উপন্যাসের সংখ্যা বিশটির বেশি বলেই ধরা হয়। এর বাইরেও তিনি লিখেছেন অজস্র গল্প, দিনলিপি ও ভ্রমণকাহিনী।
বিভূতিভূষণের লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য তাঁর প্রকৃতি-ঘনিষ্ঠ, সংবেদনশীল বর্ণনাভঙ্গি। নিবিষ্ট পাঠকের কাছে এই প্রকৃতি-বর্ণনার আধিক্যের কারণে কিছু রচনা আঙ্গিকগত দিক থেকে পুনরাবৃত্তিমূলক মনে হতে পারে। তবু তাঁর সাহিত্যভুবনের গভীরতা ও বৈচিত্র্য অনস্বীকার্য।
নিচে বিভূতিভূষণের রচনাবলীর ভেতর থেকে ৫টি উপন্যাসের তালিকা দেওয়া হলো যেগুলো না পড়লে বিভূতিভূষণের লেখা পড়ার স্বাদ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
আরণ্যক
আরণ্যক বাংলা সাহিত্যে একটি অভিনব রচনা। এখনও অসংখ্য পাঠক তাদের প্রিয় উপন্যাসের তালিকাতে আরণ্যককে স্থান দেন। জীবন সম্পর্কে কোনো গভীরতর দার্শনিক বোধ বা সত্য উপলব্ধি নয় বরং নির্ভেজালভাবে প্রকৃতিনিবিষ্টতা পাঠককে এই উপন্যাসের দিকে টানে।
এ উপন্যাসে সভ্যতা ও প্রকৃতির দ্বন্দ্ব বেদনাবিধুরভাবে পাঠকের অন্তরে ছাপ ফেলে যায়। আরণ্যক উপন্যাসে বিভূতিভূষণের নিবিষ্ট প্রকৃতিমুখী এবং দিনলিপিসুলভ আন্তরিক বর্ণনাভঙ্গীর গদ্যের দেখা মেলে।
পথের পাঁচালী
পথের পাঁচালী বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। গ্রামীণ জীবনের এত ঘনিষ্ঠ বর্ণনা যে কোনো ভাষার সাহিত্যেই বিরল। পথের পাঁচালীর অপু ও দুর্গা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পাঠক-ঘনিষ্ঠ চরিত্র।
অপু ও দুর্গার শৈশবের মধ্য দিয়ে জীবনের করুণ অথচ সুন্দর রূপ প্রকাশ পেয়েছে। বলা যায় এটি বিভূতিভূষণের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী রচনা।
দৃষ্টিপ্রদীপ
অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত হলেও দৃষ্টিপ্রদীপ উপন্যাসটি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি গভীর ও চিন্তাশীল রচনা। এ উপন্যাসটি না পড়লে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যজগৎ সম্পর্কে অনেকটাই অজানা থেকে যাবে।
মানুষের অন্তর্জগৎ, নৈতিক দ্বন্দ্ব ও মানসিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে লেখা একটি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস এটি। এখানে বাহ্যিক ঘটনার চেয়ে চরিত্রের মনের ভেতরের ঘটনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আদর্শ হিন্দু হোটেল
বাংলা দেশের একটি অখ্যাত রেল-বাজারের সবচেয়ে ব্যস্ত ভাতের হোটেলের রাঁধুনে বামুনের দরিদ্র জীবন, নিজ কাজের প্রতি তার অসাধারণ নিবেদন এবং সংগ্রামের গল্প এটি। রাঁধুনির নাম হাজারি ঠাকুর।
প্রায় বিপন্ন ও নিরাশ অবস্থা থেকে কাজের প্রতি মমতা ও সততার জোরে হাজারি ঠাকুরের আদর্শ হিন্দু হোটেল প্রতিষ্ঠার গল্প এ উপন্যাস।
চাঁদের পাহাড়
সবশেষে আরেকটি উপন্যাসের কথা উল্লেখ না করলে বিভূতিভূষণের সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। আর সেটি হলো কিশোর অ্যাডভেঞ্চার সাহিত্যে বিভূতিভূষণের অসাধারণ সংযোজন চাঁদের পাহাড়।
আফ্রিকার অজানা প্রান্তরে অ্যাডভেঞ্চার, রহস্য ও সাহসিকতার গল্প এটি। কিশোর পাঠককে কেন্দ্র করে লেখা হলেও এর রোমাঞ্চ ও কল্পনার বিস্তার সব বয়সের পাঠককে আকর্ষণ করে।
বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাসের তালিকায় এর স্থান হবে একেবারে উপরের দিকে।


